হাজিপাড়ার যারা পুরনো অধিবাসী কিংবা প্রবীণ, তাদের মাঝখান থেকে হাতেগোনা দুয়েকজন বিস্তৃতপ্রায় কাহিনীটি ইনিয়ে বিনিয়ে অথবা জোর করে হলেও মনে রাখে। কেউ বলে আসলে এই কাহিনী হাজিপাড়ার তখনকার বাসিন্দাদের একধরনের সংকটের কাহিনী। তারা বলে আবুর মা শ্যামাসুন্দরী এবং কিছুটা পলকা হলেও অন্যের ঈর্ষার চোখ তার গায়ের কাপড় ভেদ করত। তার বাড়ি ছিল রাস্তার ধারে, যেখানে তেলীকোনা থেকে হাউজিং এস্টেট পর্যন্ত লম্বালম্বি রাস্তার পেট চিরে আরেকটি পূর্বমুখী রাস্তা সৃষ্টি ঠিক সেখানটায়। তার স্বামী যখন তাকে বিয়ে করে তখন গ্রামের সর্দার আইজুদ্দি মিয়া তাকে ভূমিহীন বলে রাস্তার পাশে ঐ ঘরটি তুলে দেয়। ঘর উঠানোর কাজে বারবার শ্রমিকেরা যখন বাঁধার সম্মুখীন, অর্থাৎ ঘর উঠাতে গেলেই ঝড়ো হাওয়া, বৃষ্টি অথবা অন্যান্য কারিগরি সমস্যা যখন দীর্ঘসূত্রিতার সূচনা করে তখন তারা, লোকে বলে, আইজুদ্দিকে এই ঘটনা জানায় এবং আইজুদ্দি বলে-“ শালার অভাইগ্যা, ঘর উডাইয়া দিতে চাইলাম এইহানেও গ্যানঞ্জাম; বিয়া করাইয়া কি মুসিবতেই না পড়লাম, ওফ!”
এরপর আবুর মার কোল জুড়ে আবু আসে। আবু খেলাধুলা অথবা ধুলাখেলা করে দিন কাটায়। যেহেতু আবুর সঙ্গী-সাথীরা গ্রামে গ্রামে খেলার মতো কোন মাঠ নির্বাচন করতে পারে না, তাই তারা রাস্তার ছাইরঙ্গা পিচের উপর লাফালাফি কিংবা দাপাদাপি করে। পাড়ার লোকেরা বলে, ঠিক এই জায়গা থেকেই আবুর মার মুসিবত শুরু হয়। যৌবনের উঠতি প্রেম, অথচ তার স্বামী জগলুল হায়দার কি কারণে যেন আর ঘরে ফেরেনা। তখন একাত্তরের সময় ছিল এবং হাজিপাড়াবাসীর একমাত্র মসজিদের ছাদে পাক-হানাদার বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে। পট পরিবর্তনের এই হুজুগে সর্দার আইজুদ্দি সহ অধিকাংশ পাড়াবাসী নূরপুর অথবা তেলীকোনা হয়ে বিবির বাজার পেছনে ফেলে সোনামূড়া চলে যায়। পাড়ার লোকেরা বলে যে তারা ঐখানে রিফুজি ক্যাম্পে উঠে এবং জগলুল হায়দারও এ প্রবাহে গা ভাসিয়ে সোনামূড়া কিংবা আগরতলা মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে যায়, জগলুল হায়দার মুক্তি হয় অথবা কেউ কেউ বলে সে আগরতলা কিংবা সোনামূড়া যাবার আগেই পাকবাহিনীর হাতে মারা পড়ে এবং আবুর মার মুসিবতের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। পাড়ার বাসিন্দারা একে একে চলে গেলেও আবুর মা জগলুল হায়দারের অপেক্ষায় হাজিপাড়ায় থেকে যায়।
আবুর বয়েস ক্রমে সাত কি আট হলে সে আবারো ছাইরঙ্গা পিচের উপর খেলাধুলা কিংবা ধুলাখেলা করে এবং ঘরে ফিরে আসে এবং তার মাকে বলে- “মা, বন্দুকঅলারা ক্যাম্প থেইকা খাড়ায়া মুতে কেন?” তার মা চুপ করে থাকে এবং গুনগুনিয়ে কান্দে। পরদিন চৌদ্দই মার্চ রবিবার বিকেলে অথবা সকালে পাকবাহিনীর জলপাইরঙ্গা সাঁজোয়া যানের তলে পড়ে আচমকা আবু মারা যায়। আবুর মা বিলাপ করে, তার চোখে কালি পড়ে এবং এর ধারাবাহিকতায় তার চোখে অশ্রুজনিত ঘা দেখা দেয়। এবং এই বিলাপের সুর ক্যাম্পে পৌঁছালে পাকি ক্যাপ্টেন আবুর মাকে তুলে আনতে তার অনুগত, একান্ত বাধ্যগত সিপাহিকে নির্দেশ দেন অথবা হতে পারে কোন রাজাকার বিলাপের সুরে বিরক্ত হয়ে এমনি এমনিই আবুর মাকে তুলে আনে এবং এতে করে আবুর মার নিত্য দুঃস্বপ্ন হঠাৎ করেই দর্শনযোগ্য হয়ে পড়ে। ষোলই ডিসেম্বরের পর অথবা এর কিছুদিন আগে পাকবাহিনী হাজিপাড়া ছেড়ে চলে গেলে আবুর মা সূর্যের আলোয় চোখ কচলায় এবং দেখে সে আর সোজা হয়ে হাঁটতে পারে না, হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে হয় এবং সে হামাগুড়ি দিয়েই হাঁটে। এভাবে বছরের পর বছর চলে যায়, যদিও আবুর মা মনে করে তার সময় থেমে গেছে, তারপরও সময় চলে যায়। নিজঘরে ফেরা হাজিপাড়ার আদি বাসিন্দারা নতুন করে সবকিছু শুরু করলেও আবুর মার নির্লিপ্ততা তাদের ভেতর এক প্রকার শোকের জন্ম দিতে থাকে। আবুর মাকে হয়তো তারা কিছু খেতে দেয় অথবা তাকে দিয়ে এটা সেটা কাম করায়। কিন্তু এভাবে যখন সময় চলে যায় পট আবারো কিছুটা ধীরে পরিবর্তীত হতে থাকে। গণতন্ত্র থেকে সমরতন্ত্র, সমরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র করতে করতে দ্রব্যমূল্যের দাম আকাশ ছোঁয় অথবা কেউ কেউ বলে যে পশ্চিমা জৈব জ্বালানীর চাহিদা পূরণে ব্যাপক খাদ্য শস্যের প্রয়োজন পড়াতে তৃতীয় বিশ্বে দ্রব্যমূল্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। ফলে এই পর্যায়ে হাজিপাড়ার বাসিন্দাদের দুয়ার একটু একটু করে বন্ধ হতে শুরু করে এবং আবুর মা অদূরবর্তী হাউজিং এস্টেটে সদ্য নির্মিত আলুর কোল্ডস্টোরেজ-এ আলু বাছুনিতে বেগার খাটে।
কেউ কেউ বলে আবুর মা তখন আধা পঁচা আধা ভালো আলুর পঁচা অংশ ফেলে বাকীটা পুড়িয়ে খায়। তারা আরো বলে মুসিবতের শুরু আসলে জগলুল হায়দারের রেখে যাওয়া কাঁসার বাটি থেকেই এবং তখন তারা বলে যে- “সে আরেক কাহিনী” । ….. কেননা আবুর মার তখন ক্রমাগত স্মৃতিভ্রংশ হতে থাকে এবং একদিন সে তরিঘড়ি করে আথবা এমনিতে হাত ধুতে অথবা জল নিতে ঘরের পাশের কলতলায় আসে। কাঁসার বাটিটা কলতলায় দেখে সে ভাবে এটা তার কেন ঘরে নিয়ে যেতে মনে ছিল না অথবা সে ভাবে আবুর বাপের একটা স্মৃতি মাত্র, বিলাই নিয়ে গেলে অথবা কাউয়ার দল যে হারে বেড়েছে ঠোঁটের আগায় করে নিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কাঁসার বাটি হাতে নিয়ে গোধূলির লাল আভার প্রতিফলন ঠিকরে পড়লে আবুর মার নাকে এক প্রকার গন্ধ ঠেকে। নাক কুঁচকে গন্ধ খোঁজতে গিয়ে লুলা হাত পা নিয়ে আবুর মা কুকুরের মত কলতলায় হামাগুড়ি দিয়ে এদিক-ওদিক কিছু মরে পড়ে আছে কিনা শুঁকতে থাকে। না পেয়ে বিড়বিড় করে-বৃষ্টির পানি, হয়তোবা কলের পানিই জমেছিল কলতলার সরু বাধেঁর আশেপাশে, আবুর মার হাঁটু অথবা কাপড়ের আঁচল অথবা হাতের তালু নোংরা হয়ে যায়। আবুর মা ভাবে-“মাডি ফঁচা গন্ধ!” ঘরে ফিরে অথবা ঝুপড়িতে ফেরার পর পুনরায় গন্ধ পেলে আবুর মা পিন্দনের কাপড় খোলে শুকতে থাকে-“নাহ্ , গন্ধ এইডাত না” বলে পুনরায় কাপড়ের ভাঁজ শরীরে ফেলে রাখে। হাত শুঁকে গন্ধের আবিষ্কার তাকে কাঁসার বাটির দিকে নিয়ে যায় আবার। বাটিখানা তুলে গন্ধের তীব্রতা পেট মুচড়িয়ে, গুলিয়ে গলা অব্দি নিয়ে আসে তার। আবুর মার পলিথিন চালা ঘরে অথবা ঝুপড়িতে ঈষৎ লাল সূর্য ক্রমান্বয়ে ধুলিশব্দ তুলে তার চুলের আগা স্পর্শ করে মগজে ঢুকে পড়ে। তার মনে পড়ে কাঁসার বাটিতে কাল রাত্তিরে কোল্ডস্টোরেজ থেকে আনা আধা পঁচা আধা ভালো আলুর পঁচা অংশটুকু ফেলে বাকিটা পুড়িয়ে খেয়েছিল। সে ফের ভাবে-“ফঁচা আলুতো হালাই দিছিলাম, কিন্তু গন্ধ আইয়ে কোয়ানথাইক্কা”?
রাত গভীর হতে শুরু করলে অন্ধকারের রং আলকাতরার দেয়ালের মতো সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, আবুর মা শুয়ে শুয়ে হাত বাড়িয়ে রোজদিনকার মতোন দেয়াল ছুঁতে চেষ্টা করে। গন্ধের কথা তার পুনরায় মনে পড়লে সে বলে-“গন্দ আইব ক্যা, গন্ধ না, অনন্য কিছু মুনে হয়”। ঠিক তখনই তার হাতের আঙ্গুলে অথবা চেটোতে কিছুটা আঠা আঠা তরল পদার্থ লেগে যায় বলে তার মনে হতে থাকে। সে ভাবে-হুদাই, কিছু না”। কিন্তু হাতের পাঁচ আঙ্গুল একসঙ্গে করলে তার কাছে মনে হতে থাকে রাতের ঘন অন্ধকার বুঝি তার হাতে লেগে গেছে এবং সে বলে-“কি মুছিবতেই না পড়লাম একবার দেহি গন্ধ লাগে, আবাত্তি দেহি আডা আডা লাগে।” পাড়ার লোকেরা বলে, আবুর মার মুছিবতের শুরু কাঁসার বাটি থেকেই এবং তারপর আবুর মা শোয়া থেকে উঠে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় অথবা ভরাট চান্দের আলোয় অথবা মসজিদের ভেতর থেকে আসা আলোর সামনে হাত মেলে ধরে। চান মিয়া না মধু অথবা সাদ্দামের বাপ ওই পথে যেতে থাকলে আবুর মার হাতের কসরত কিংবা বিশেষ মুদ্রা দেখে থামে। আবুর মা চান মিয়া না হয় মধু না হয় সাদ্দামের বাপকে বলে-
দেহ তো মিয়া আতে কি লাগলো?
-আলকাতরা নিহি?
দূর মিয়া আলকাতরা আইব কইত্থাইক্যা?
-তয় পঁচা পাতা নাইলে মুরগার গু লাগছে মুনে অয়!
দূর, আমার কি মুরগা আছে নিহি যে গু লাগবো?
আবুর মা কিংবা চান মিয়া না হয় মধু অথবা সাদ্দামের বাপ অথবা উভয়েরই মনে হতে থাকে এটা একটা ধন্দ বটে, কিন্তু পরক্ষণে আবুর মা অথবা পথচারী অথবা আবুর মা-ই বলে উঠে-
ফঁচা আলু অইতে পারে!
-হ, অইতে পারে!
আবুর মা ঘরে অথবা ঝুপড়িতে ফিরে আসে এবং বলে- “কি মুসিবতেই না পড়লাম”!
এভাবে নিত্যদিনকার মতো মরহুম মকবুল মিয়া অথবা মরহুম ছফর আলীর চৌচালা ঘর ঠেলে সূর্য পুবাকাশে উঠে এলে আবুর মার পেটে খিদা লেগেছে বলে মনে হতে থাকে। শামসু অথবা আলী মিয়া অথবা শামসুই হবে, তাকে দেখে হোটেলের বেড়ার পাশে কল্লা তুলে তেহেরীর ডেকচির দিকে তাকিয়ে আছে। বলে- “আমার দোয়ান ছাড়া অইন্য দোয়ান দেহ না? যাও এইখান থাইক্কা” বলে কি মনে করে যেন হোটেলের বয় জসিমুদ্দিকে দিয়ে আবুর মার কাছে পলিথিনের ঠোঙ্গা ভরে অথবা ঠোঙ্গা অর্ধেক খালি রেখে তেহারী পাঠায়, সেখানে বসেই আবুর মা তা খেয়ে নেয়। হোটেলের খদ্দেরেরা বলে এ প্রক্রিয়া আবহমান কাল ধরে চলে আসছে, পাড়ার প্রাপ্তবয়স্ক বাসিন্দারাও এ কথার সত্যতা প্রকাশ করে এবং তাদের বাপেরাও আবুর মার এই ঊষা ভোজন পর্ব দেখে আসছে বলে স্বীকার করে। এভাবে রোজদিনকার মতো আবুর মা রফিকের দোকান, হাফেজ সাবের বাড়ি পিছনে ফেলে, নমঃশুদ্র পাড়া পার হয়ে হাউজিং এস্টেটের কোল্ডস্টোরেজে যায়। সরাসরি আলুর বস্তার গায়ে আলুর ফুটে উঠা চিত্র দেখে আবুর মার শৈশবের স্মৃতির কথা মনে পড়ে এবং ইতিউতি করে সে আলু বাছতে বসে যায়। দুপুর পর্যন্ত আলু বাছতে বাছতে সে আলুর কয়েকটা তার ছেঁড়া পুঁটলিতে ঠুকিয়ে ফেলে। তারপর কোল্ডস্টোরেজের গুমোট হাওয়ার অদৃশ্য প্রাচীর আর সদৃশ্য চৌকাঠ ডিঙিয়ে সূর্যের উলম্ব কড়া আলোর মাঝে চোখ কচলায় এবং প্রতিদিনের মতো মাদকাসক্ত পুর্নবাসন কেন্দ্র, সেলিম কমিশনারের বাড়ি, গ্রিন হাউজ নার্সারি পেছনে ফেলে আপন ঘর কিংবা ঝুপড়িতে ফিরে আসে। আলু কেটে উনুনে পুড়ানোর আগে সে আবার ধন্ধে পড়ে অথবা অপরাধবোধে ভুগে। “ফঁচা আলুর লগে ভালা আলু আইলো ক্যামনে ? আইচ্চা আনন কি খারাপ? নাহ গরিবের অত কিছু চিন্তা করন নাই, গরিবগো হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্দ, খিরিষ্টান সব এক”! আলু পোড়ানোতে ব্যস্ত থাকাতে কিছুটা জুড়িয়ে নিয়ে একমাত্র কাঁসার বাটিতে নিয়ে খায় এবং খাওয়া শেষে কলতলায় যায়, বাটি ধুয়ে মন ভুলে ফেলে আসে। মনে পড়লে কাঁসার বাটি আনতে আবার কলতলায় যায় এবং আগের দিনের মত নাকে গন্ধ টের পায়, কাঁসার বাটি হাতে নিয়ে তখুনি নাকে গন্ধ নিতে নিতে ঘরে কিংবা ঝুপড়িতে ফিরে আসে এবং বিড়বিড় করে অথবা উচ্চৈঃস্বরে বলে-“কি মুসিবতেই না পড়লাম”। পাড়ার লোকেরা হয়তো এ চিৎকার শোনে অথবা শোনে না, হয়তো বা শুনলেও গা করে না এবং সবকিছুই আগের মতো চলতে থাকে। প্রতিদিনের মতো আবুর মা দেখে সূর্য মগজে ঢুকছে এবং গন্ধের উৎস যে পঁচা আলু অথবা অন্য কিছু এ নিয়ে ক্রমাগত বিভ্রান্ত হতে থাকে। ঘোরে নিপতিত হতে হতে বেঘোর আবুর মা স্বপ্নে দেখে সারি সারি পাহাড়সম আলুর বস্তার নিচে সে রক্তের মন্ড অথবা রক্তমাখা আলু নাড়াচাড়া করছে। ফলে তার ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে একপর্যায়ে সামনের দিকে হাত বাড়ালে হাতে আঁঠালো পদার্থের মতন কি যেন লেগে যায়। আবুর মা ভাবে মনের ভুল। এ দ্বিধাদ্বন্দ্বে আবুর মা ঘরের বাইরে আসে। মসজিদের আলোয় অথবা চান্দের আলোয় অথবা ল্যাম্পপোস্টের টিমটিম ষাট পাওয়ারের বাত্তির নিচে হাত নাড়তে দেখে চান মিয়া না হয় মধু অথবা সাদ্দামের বাপ বাড়ি ফেরার পথে নামে, বলে-
আইজও কি আতে আলকাতরা লাগ্চে তুমার?
-হ, না, এমুনই মনে অয়!
তয় কি মুরগার গু?
-না, আমি কি মুরগা পালি?
পঁচা পাতা অইতে পারে!
-পাতা পামু কই?
তয় কি পঁচা আলু?
-অইতে পারে; বলে আবুর মা ঘরে অথবা ঝুপড়িতে ফিরে আসে এবং বলে-“কি মুসিবতেই না পড়লাম”! নিয়মিত সূর্য পূবদিকের মরহুম মকবুল কিংবা ছফর আলীর বাড়ি ঠেলেই উঠে এবং আজও তার ব্যতিক্রম হয় না। আবুর মাকে সামসু কিংবা আলীর হোটেল বয় প্রতিদিনের মতো পলিথিনের ঠোঙ্গায় তেহারী দেয় এবং সে তেহারী খায় এবং শোনে হোটেলের ভেতর থেকে কে যেন বলে, হতে পারে পোংটা কোন পোলা অথবা হতে পারে সাদ্দাম, বলে উঠে- “আবুর মা তুমি যে রাইতে আতের আডা লয়া রোডে আহো, আর মাইনষেরে বিরক্ত কর, তুমি মুনে হয় জান না এই আডা কিয়ের আডা?” বলার সাথে সাথে যখন পুরো হোটেল হেসে উঠে তখন আবুর মা -“তামানডি মাগির পুত” বলে কোল্ডস্টোরেজের দিকে যায় এবং যেহেতু যাওয়ার পথে রফিকের দোকান অথবা হাফিজ সাবের বাড়ি অথবা গোলমার্কেট পড়ে সেহেতু এগুলো পেছনে পড়ে যায়। আবুর মা আলু বেছে বেছে যখন ক্লান্ত তখন অজান্তে অথবা সজান্তেই ভালো আলুর কয়েকটা পুটলিতে পুরে ফেলে এবং আবুর মার চোখ এদিক ওদিক তাকালে আলুর পাহাড়ের উপর থাকা ছদরুল কি যেন আঁচ করে; সে বলে অথবা বলে না, আবুর মা হয়তো ভুল শোনে অথবা সে হয়তো বলেই-“আবুর মা সাবধান”!!!
এবং পূর্ব নিয়মে সূর্য উঠলে অর্থাৎ সূর্য মরহুম মকবুল মিয়া অথবা ছফর আলীর চৌচালা ঘর ঠেলে উঠলে আবুর মা পাড়ার সকলের বিমর্ষ কিংবা অতঙ্কিত চেহারা দেখে আঁৎকে উঠে এবং সে তেহারী খায়। পাড়ার বাসিন্দারা বলে-“আবুর মার আতে কিয়ের আডা না কিতা লাগে, আবাত্তি কয় গন্ধ লাগে, বেডি মুনে হয় পাগল অইছে এবার”। এসব বলাবলির পরও পাড়ার বাসিন্দাদের নিস্তার মেলে না এবং তারা ক্রমাগত এক বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে যেতে থাকে। তারা ভাবতে থাকে অথবা বলাবলি করে এটা আসলে আবহমান কাল ধরেই ঘটতে থাকে এবং এতে নতুনত্ব বলে তেমন কিছু নেই! আবার কেউ কেউ আঁড়ালে সন্দেহও পোষণ করে, যদিও ঠিক কি ধন্দে তারা বিভ্রান্ত তা র্নিণয় হয় না এবং সমাধান না হতে হতে আবুর মা পুনরায় কোল্ডস্টোরেজে যায় এবং পুনরায় বলে-“কি মুসিবতেই না আছি” এবং তখনি ছদরুল ইচ্ছে করেই অথবা তার হাত ফসকে একটি আলুর বস্তা আবুর মার পিঠে পড়ে যায়, তারপরও আবুর মাকে বেঁচে গেছে বলে মনে হয় এবং তার কোমর আলগা হয়ে গেলে হাঁচড়ে পাঁচড়ে ঘরে অথবা ঝুপড়িতে ফিরে আলু পুড়িয়ে খায় অথবা মরহুম মকবুল মিয়ার বাড়িতে যায় এবং মকবুল কন্যা তাকে মুরগীর গোশত হয়তোবা মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ায়। তারপর ঘরে অথবা ঝুপড়িতে অথবা অন্য কোথাও সে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন সকালে অথবা বিকালে পাড়ার বাসিন্দাদের অথবা হোটেলের খদ্দেরদের মনে হয় তারা বহু যুগ ধরে আবুর মাকে দেখে না এবং বিভ্রান্তির এক ঘোরময় গোলক ধাঁধায় তাদের মনে হতে থাকে তারা যেন আবহমান কাল ধরেই পাঁক খায় এবং এর কিছু দিনপর, হয়তো সাথে সাথেই হাউজিং এস্টেটের আলুর কোল্ডস্টোরেজের আশপাশের এলাকায়, নমঃশুদ্র পাড়ায়, হাজিপাড়ায়, কাঁটাবিল ও তেলীকোনায় এক প্রকার তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং এ সকল এলাকার বাসিন্দারা বলে যে তারা সবাই এ গন্ধ টের পায়। চান মিয়া না হয় মধু অথবা সাদ্দামের বাপ এই গন্ধ সন্ত্রাসে সবচেয়ে বেশি র্জজরিত হয়, যদিও পাড়াবাসীরা বলে যে এমনটি নাও হতে পারে, হয়তোবা চান মিয়া না হয় মধু অথবা সাদ্দামের বাপ এক ধরণের গন্ধ বাহক হিসেবে সক্ষম থাকে এবং পাড়াবাসীরা আরো বলে যে তারা এই গন্ধ অন্যকে শুঁকতে উৎসাহিত করে, ফলে অন্যরা এই গন্ধ টের পায় এবং বলে-“এইটা কোল্ডস্টোরেজ না হয় অন্য কোন জায়গার আলু পঁচা গন্ধ অইতে পারে।” এভাবে হয়তো সপ্তাহের পর সপ্তাহ, হয়তো মাসের পর মাস, হয়তো বছরের পর বছর ধরে এই গন্ধ এমন ভাবে ছড়িয়ে যায় যে তা মানুষের মগজে একেবারে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে এবং ক্রমান্বয়ে তা সয়ে আসে। সময়ের চাকা যেহেতু পেছনে গড়ায় না, সামনেই গড়ায় সেহেতু পাড়ার উৎসুক কেউ কেউ অথবা নতুন কোন আগন্তুক এলে পাড়ার বাসিন্দারা স্মৃতি থেকে এই গন্ধ এনে তাদের শুঁকায়, অথবা হয়তো শুঁকায় না,তারা নিজেরাই বিস্তৃত হয়ে গেলে নিজেদের স্মৃতিকোষ থেকে এক চিমটি, দু চিমটি বা তিন চিমটি করে, হতে পারে এক মুঠ করেই এই গন্ধ নাকের কাছে এনে নিজেরা শুঁকে এবং হাজিপাড়ার ঐ সকল নতুন আগন্তুক অথবা যারা অতিথি হিসেবে আসে হাজিপাড়ায় কিংবা কাঁটাবিল অথবা তেলীকোনায়, হয়তো এরা সবাই ভ্রমনোৎসুক আগন্তুক, তাদের কেউ কেউ নিজ পাড়ায়, শহরে অথবা পরিবারে ফিরে এসে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, তারা অন্যদের জিজ্ঞেস করে যে-
এক. বলেনতো এইটা কিসের গন্ধ?
দুই. বলেনতো এই গন্ধ ছড়ায় ক্যামনে?
তিন. বলেনতো কোল্ডস্টোরেজে আলু পঁচতে থাকলেও মাইনষে ক্যান না খায়া মরে?
………অনাদিকাল ধরে এইসব র্চচা নতুন কোন আগন্তুক কিংবা হাজিপাড়ার বাসিন্দাদেরকে ছাড়েনা এবং তা তারা জারি রাখতে বাধ্য হয়ে পড়ে, হয়তো এরা এসব জারি রাখতে চায়না, গন্ধই তাদেরকে এই ধারা জারি রাখতে বাধ্য করে…………